বিশ্বকাপের শেষ বাঁশিতে থামল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল-উন্মাদনা

শিহাব আহসান, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

Jul 21, 2026 - 23:16
 0
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশিতে থামল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল-উন্মাদনা
বিশ্বকাপের শেষ বাঁশিতে থামল গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল-উন্মাদনা

রাত তখন গভীর। চারপাশে নীরবতা, অথচ গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যেন অন্য এক পৃথিবী। কোথাও কয়েকজন তরুণের গলায় উত্তেজিত চিৎকার, কোথাও বন্ধুরা গোল হয়ে বসে শেষ মুহূর্তের হিসাব কষছেন। কারও গায়ে আকাশি-সাদা জার্সি, কারও হাতে স্পেনের পতাকা। কেউ শেষবারের মতো প্রিয় দলের জয়ের সম্ভাবনা বোঝাচ্ছেন, কেউ আবার প্রতিপক্ষকে হারানোর যুক্তি খুঁজছেন।

বিশ্বকাপ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়। এটি বন্ধুত্ব, আবেগ, তর্ক, আড্ডা এবং স্মৃতিরও নাম। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আড্ডায় ফুটবল নিয়ে আলোচনা যেন একসময় আলাদা এক জগৎ তৈরি করে। ফিফার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কি না, কোন দল কোথায় ভালো খেলেছে, কোন খেলোয়াড়ের কী করা উচিত ছিল, সবকিছুই তখন গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল হয়ে ওঠে যুক্তির বিষয়, আবেগের বিষয়, কখনোবা বন্ধুত্বপূর্ণ বিতর্কেরও কারণ।

বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার সমর্থকদের যুক্তিতে যেন বাড়তি আত্মবিশ্বাস থাকে। সদ্য জেতা বিশ্বকাপের স্মৃতি তাদের কথায় নতুন মাত্রা যোগ করে। মেসির উত্তরাধিকার, আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্য আর ফুটবলীয় ঐতিহ্য, সব মিলিয়ে তাদের আত্মবিশ্বাসের কমতি নেই। অন্যদিকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ভক্তদেরও যুক্তির ভাণ্ডার কম নয়। পর্তুগালের সমর্থকেরা প্রিয় তারকার ব্যক্তিগত অর্জন, নেতৃত্ব ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাফল্য সামনে এনে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখেন।

আর ব্রাজিল? বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ব্রাজিল যেন আলাদা এক আবেগের নাম। তবে গত দুই দশকের বিশ্বকাপ-খরা তাদের সমর্থকদের ওপরও চাপ তৈরি করেছে। এবারও হেক্সার স্বপ্ন পূরণ হলো না। ভাইকিংদের কাছে হেরে রাউন্ড অব সিক্সটিন থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে সেলেসাওদের। ফলে বিশ্বকাপের শেষ প্রান্তে এসে ব্রাজিল-সমর্থকদের অনেকটাই দর্শকের ভূমিকায় থাকতে হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের জাত চেনাতে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও স্পেন। সদ্য বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনার সামনে ছিল স্পেনের তরুণ ও ক্ষুধার্ত এক দল। ম্যাচের শুরু থেকেই উত্তেজনা ছিল টানটান। একদিকে আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক সাফল্য, অন্যদিকে স্পেনের তারুণ্য, গতি ও কৌশল। দুই দলের লড়াই যেন পরিণত হয়েছিল ফুটবলীয় দর্শনের সংঘর্ষে।

গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেও তখন সেই উত্তেজনার ছায়া। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি পরা সমর্থকেরা ম্যাচের প্রতিটি মুহূর্তে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বসে ছিলেন। বিশেষ করে মেসির ডাই-হার্ড ভক্তদের চোখে তখন ছিল এক ধরনের বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়াবেই।

কিন্তু ফুটবল সব সময় গল্পের মতো শেষ হয় না।

৯০ মিনিটের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সময় যত গড়ায়, ততই বাড়তে থাকে উত্তেজনা। অবশেষে ১০৬ মিনিটে স্পেনের গোল। মুহূর্তেই বদলে যায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাত। এতক্ষণ যেখানে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, সেখানে নেমে আসে নীরবতা। আর স্পেন সমর্থকদের উল্লাসে ক্যাম্পাস যেন মুহূর্তেই বিশ্বকাপের গ্যালারিতে পরিণত হয়।

২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল স্পেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও বড় মঞ্চে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিল তারা। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা সমতায় ফেরার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পেনের রক্ষণ ভেদ করতে পারেনি তারা।

রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্পেন-সমর্থকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে ক্যাম্পাস। কেউ পতাকা হাতে ছুটছেন, কেউ বন্ধুদের জড়িয়ে ধরছেন, কেউবা আনন্দে নাচছেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের অনেকেই তখন নির্বাক। কারও চোখে হতাশা, কারও মুখে অবিশ্বাস। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে ক্যাম্পাসে মেসি, আর্জেন্টিনা আর বিশ্বকাপ নিয়ে তর্ক চলছিল, সেখানে মুহূর্তেই বদলে গেল দৃশ্যপট।

তবে বিশ্বকাপ শেষ হলেও ফুটবল শেষ হয় না। বরং থেকে যায় অসংখ্য গল্প। বন্ধুদের সঙ্গে রাত জাগার গল্প, তর্কে জড়িয়ে পড়ার গল্প, প্রিয় দলের জয়ে উল্লাসের গল্প, আবার হারের পর নীরবে বসে থাকার গল্প। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্যও এই রাত তেমনই এক স্মৃতি হয়ে থাকবে।

ক্লাস, পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততা ভুলে যে তরুণেরা এক রাতের জন্য ফুটবলকে জীবনের কেন্দ্র বানিয়েছিলেন, ফাইনালের শেষ বাঁশির সঙ্গে শেষ হলো তাঁদের সেই উন্মাদনার অধ্যায়। বিশ্বকাপের রাজত্ব হয়তো স্পেনের দখলে গেল, কিন্তু গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে সেই রাত, উল্লাস, হতাশা, তর্ক আর আবেগে ভরা, চিরকাল বেঁচে থাকবে।