দেখে নিন ৯ম জাতীয় পে-স্কেলে কার বেতন কত বারছে!
ডেস্ক রিপোর্ট
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে নবম জাতীয় পে-স্কেল।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ (আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর) থেকেই এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে সম্পূর্ণ সুপারিশ একবারে নয়, বরং তিন মেয়াদে বা তিন অর্থবছরে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে আগামী জুলাই থেকে সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শুধুমাত্র মূল বেতন (Basic Salary) গড়ে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে এই নতুন পে-স্কেলের চাপ সামলাতে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ 'থোক বরাদ্দ' রাখার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে।
তিন বছরের রোডম্যাপ: যেভাবে বাস্তবায়িত হবে নতুন স্কেল
সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ (১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত) করার সুপারিশ করেছিল। তবে সরকারের আর্থিক টানাপোড়েন বিবেচনা করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা কমিটি মূল সুপারিশ কাটছাঁট না করে এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের একটি কৌশলগত রোডম্যাপ তৈরি করেছে:
প্রথম ধাপ (জুলাই, ২০২৬): সকল গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন (Basic) ৫০% বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানের ১০% মহার্ঘ ভাতা এর সাথে সমন্বয় করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (২০২৭-২৮ অর্থবছর): মূল বেতনের বাকি অংশটুকু বৃদ্ধি করা হবে।
তৃতীয় ধাপ (২০২৮-২৯ অর্থবছর):চূড়ান্ত ধাপে নতুন পে-স্কেলের সাথে আনুষঙ্গিক বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা পূর্ণাঙ্গভাবে যুক্ত হবে।
২০টি গ্রেডের প্রস্তাবিত কাঠামো ও বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য চিত্র
নতুন পে-স্কেলেও বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হচ্ছে। জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ এবং বর্তমানে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভিন্ন গ্রেডের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
১. গ্রেড-১ (সচিব বা সমমানের পদ):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ১,৬০,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ১,১৭,০০০ টাকা।
২. গ্রেড-৪ (অধ্যক্ষ বা সমমানের পদ):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ৫০,০০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ১,০২,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ৭৫,০০০ টাকা।
৩. গ্রেড-৬ (সহকারী অধ্যাপক বা সমমানের পদ):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ৩৫,৫০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ৭২,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ৫৩,২৫০ টাকা।
৪. গ্রেড-৯ (প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা বা প্রভাষক):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ২২,০০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ৪৫,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ৩৩,০০০ টাকা।
৫. গ্রেড-১০ (সহকারী শিক্ষক বা সমমানের পদ):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ১৬,০০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ৩৩,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ২৪,০০০ টাকা।
৬. গ্রেড-১১ (১১তম গ্রেডের কর্মচারী):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ১২,৫০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ২৬,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ১৮,৭৫০ টাকা। (তবে নিম্ন গ্রেডে শতভাগ বৃদ্ধির দাবি মেনে নেওয়া হলে এটি ২৫,০০০ টাকা হতে পারে)।
৭. গ্রেড-১৬ (অফিস সহকারী বা সমমানের পদ):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে মূল বেতন ৯,৩০০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ১৯,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ১৩,৯৫০ টাকা।
৮. গ্রেড-২০ (সর্বনিম্ন গ্রেড বা অফিস সহায়ক):
বর্তমানে ৮ম পে-স্কেলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা। কমিশনের মূল প্রস্তাবিত বেতন ২০,০০০ টাকা। আগামী জুলাই থেকে ৫০% বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাব্য মূল বেতন হবে ১২,৩৭৫ টাকা। (তবে সচিব কমিটির বিশেষ বিবেচনায় নিম্ন আয়ের এই গ্রেডগুলোতে একবারে শতভাগ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হলে সর্বনিম্ন মূল বেতন ১৬,৫০০ থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সচিব কমিটির সর্বশেষ বৈঠক ও বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের (১১ থেকে ২০তম গ্রেড) মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে স্বস্তি দিতে সরকার বিশেষ বিবেচনা করছে। প্রশাসন ও কর্মচারীদের একটি বড় অংশ দাবি জানাচ্ছে যেন নিম্ন আয়ের এই গ্রেডগুলোতে এবার আংশিক নয়, বরং একবারে শতভাগ (দ্বিগুণ) বেতন বৃদ্ধি করা হয়। যদি তাই হয়, তবে ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ১৬,৫০০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যাবে আগামী জুনে বাজেট ঘোষণার পর।
সুবিধা পাবেন শিক্ষক ও পেনশনভোগীরাও
নতুন এই পে-স্কেলের আওতায় শুধু মূল প্রশাসন নয়—শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সব সরকারি চাকরিজীবী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। একই সাথে দেশের কয়েক লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও এই নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পেতে যাচ্ছেন, যা তাদের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক কষ্ট লাঘব করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া সরকারি পেনশনভোগীদের সুবিধাও বড় অঙ্কে বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, যারা মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আর ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পেনশনের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজারের ওপরের পেনশনে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির আভাস রয়েছে।
ব্যয় ও অর্থনীতিবিদদের মত
পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একবারে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। তবে তিন ধাপে ভাগ করায় এবং চলমান ১০% মহার্ঘ ভাতা সমন্বয় করায় প্রথম বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই তীব্র বাজার ঊর্ধ্বগতির সময়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে বেতন বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি ছিল। তবে শুধুমাত্র বেতন বাড়ালেই হবে না, এর পাশাপাশি বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষ এই বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সুফল পুরোপুরি পাবে না।