রাজশাহী থেকে চীনের টিওয়াইইউটি: সুমন মাহমুদের সংগ্রামের গল্প
রুশাইদ আহমেদ,কনট্রিবিউটিং রিপোর্টার, রাজশাহী
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মেন্দিপাড়া গ্রাম। সবুজ মাঠ, কৃষিজমি আর গ্রামীণ জীবনের সরলতায় ঘেরা একটি সাধারণ জনপদ। এই গ্রামেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুমন মাহমুদের। তাঁর বাবা একজন কৃষক।
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসলেও, সুমন নিজের পরিশ্রমে পৌঁছেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। সম্প্রতি চীনের তাইয়ুয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে (টিওয়াইইউটি) ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার্স করার জন্য ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েছেন এই তরুণ।
তবে তাঁর শুরুটা খুব মসৃণ ছিল না। নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের স্বপ্ন পূরণে অদম্য মানসিক শক্তির জোরে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন সুমন।
টিউশনির আয়েই এগিয়ে চলার স্বপ্ন
বেরোবিতে ভর্তি হলেও তাঁর পরিবারের পক্ষে সুমনের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে নেওয়ার উপায় ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করাতে শুরু করেন তিনি। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে টিউশনি করে নিজের প্রয়োজন মেটানো—দুটি বিষয় একসঙ্গে সামলানো ছিল তাঁর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয় বর্ষে এর সঙ্গে যুক্ত হয় গবেষণার প্রস্তুতি ও একাডেমিক কাজ। সুমনের ভাষায়, সেই সময়টা ছিল তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম ও কঠোর পরিশ্রমের অধ্যায়। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁকে পিছিয়ে দেয়নি; বরং প্রতিটি বাধা তাঁকে আরও আত্মবিশ্বাসী, ধৈর্যশীল ও দৃঢ় করে তুলেছে। সামনে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জুগিয়েছে।
মেধার স্বাক্ষর
বহু সংগ্রামের মধ্যেও একাডেমিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখেন সুমন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ৯ম ব্যাচের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি অসাধারণ ফলাফল অর্জন করেন। স্নাতক পর্যায়ে সিজিপিএ ৩.৭১ নিয়ে বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন সুমন।
এই সাফল্য তাঁর সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একই সঙ্গে বিশ্বমানের জ্ঞান অর্জন এবং গবেষণার মাধ্যমে নতুন কিছু করার আগ্রহও ধীরে ধীরে তাঁর মধ্যে আরও বেড়ে ওঠে।
গবেষণায় দীর্ঘ পথচলা
সুমনের জীবনে গবেষণা কেবল একাডেমিক প্রয়োজন নয় বরং এটি হয়ে ওঠে জ্ঞান অনুসন্ধান ও বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার একটি মাধ্যম। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক ও বাস্তব সমস্যা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা করার আগ্রহ থেকেই তিনি গবেষণার জগতে প্রবেশ করেন।
তবে পথটা মোটেও সমান্তরাল ছিল না। একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুতের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সাহিত্য পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ, উপাত্ত বিশ্লেষণ, লেখালেখি এবং একাধিকবার সংশোধনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে।
গবেষণার পথে প্রত্যাখ্যানও এসেছে বহুবার। কখনো কোনো পেপার প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়নি, আবার কখনো বড় ধরনের সংশোধনের পরামর্শ পেয়েছেন আন্তর্জাতিক নানা জার্নালের রিভিউয়ারদের কাছ থেকে। কিন্তু এসব অভিজ্ঞতাকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেননি সুমন। বরং প্রতিটি প্রত্যাখ্যান ও সংশোধনের নির্দেশনা থেকে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেছেন। সেই ধারাবাহিক পরিশ্রমই তাঁকে আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিসরে আরেকটু এগিয়ে দিয়েছে।
এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি Q1 জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি স্প্রিঞ্জার-এ একটি গবেষণা প্রবন্ধ ও আইজিআই গ্লোবাল-এর বইয়ে তাঁর দুটি অধ্যায় প্রকাশ পেয়েছে। রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের গবেষণাপত্রও। আরও চারটি গবেষণা প্রবন্ধ বর্তমানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নালে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইংরেজি দক্ষতার পরীক্ষাতেও তিনি আইইএলটিএস-এ ৬.৫ স্কোর অর্জন করেছেন।
পরিবারের ত্যাগ ও স্ত্রীর অনুপ্রেরণা
সুমনের সাফল্যের পেছনে তাঁর পরিবারের অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বাবা-মায়ের ত্যাগ ও সহযোগিতা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে উল্লেখ করেন সুমন।
দীর্ঘ এই পথচলায় তাঁর স্ত্রীর মানসিক সমর্থনও ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের মতো বড় সিদ্ধান্তের সময় স্ত্রী তাঁকে সাহস দিয়েছেন এবং স্বপ্নের পথে অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সুমনের মতে, স্ত্রীর উৎসাহ তাঁকে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে আরও দৃঢ় করেছে।
টিওয়াইইউটিতে পূর্ণ অর্থায়নে পড়ার সুযোগ
দীর্ঘ পরিশ্রমের পর সুমনের সামনে আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের তাইয়ুয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (টিওয়াইইউটি) থেকে তিনি ম্যানেজমেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার্স করার জন্য সম্পূর্ণ অর্থায়িত স্কলারশিপ পেয়েছেন। এই বৃত্তির আওতায় তাঁর শিক্ষার সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয়টি। পাশাপাশি প্রতি মাসে তিনি ২ হাজার চীনা ইউয়েন স্টাইপেন্ডও পাবেন।
সুমনের কাছে এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘদিনের ত্যাগ, স্ত্রীর নিরন্তর অনুপ্রেরণা এবং নিজের বহু বছরের শ্রম। তাই টিওয়াইইউটির ফুল-ফান্ডেড স্কলারশিপকে তিনি তাঁর সংগ্রাম ও পরিশ্রমের একটি অর্থবহ স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়
সুমনের কাছে চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি তাঁর জীবনের নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা। টিওয়াইইউটিতে গিয়ে তিনি গবেষণার আরও বিস্তৃত সুযোগ কাজে লাগাতে চান। আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন গবেষণায় যুক্ত হতে চান, যা একদিকে একাডেমিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে; অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তব সমস্যার সমাধান ও ইতিবাচক পরিবর্তনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
তরুণদের উদ্দেশ্যে সুমনের বার্তা খুবই সরল: শুধু ভালো ফলাফলই সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, নিয়মিত পরিশ্রম, ধারাবাহিকতা এবং ব্যর্থতার পর আবার শুরু করার সাহস। তাঁর নিজের জীবনও সেই কথারই প্রতিচ্ছবি।
যা বলছেন সুমনের শিক্ষক
সুমন মাহমুদের শিক্ষক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড. মো. জাহিদ হাসান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিককার কয়েকজন ছাত্রকে দেখেই সুমন মোটিভেটেড হয়েছে। ও শুরু থেকেই অনেক পরিশ্রম করেছে। এজন্য সে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে।
বেরোবির গবেষণা ক্ষেত্র নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেকে তুমুল মেধাবী এবং পরিশ্রমী। তাঁদের অনেকে শিক্ষকদের চেয়েও ভালো অবস্থানে যাচ্ছেন। তবে প্রতিবন্ধকতা এখনও আছে। বেরোবিতে পর্যাপ্ত ল্যাব নেই। আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল এবং বিশ্বমানের ডিজিটাল লাইব্রেরিগুলোতেও আমাদের প্রবেশাধিকার সীমিত। এছাড়া, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা পর্যাপ্ত প্রণোদনাও পান না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে সম্প্রতি ইউজিসি থেকে মাস্টার্স পর্যায়ে থিসিস করা শিক্ষার্থীদের অনুদান দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন ড. জাহিদ। তাঁর ভাষায়, এ সমস্যাগুলোর সমাধানে বহুমুখী উদ্যোগ নেওয়ার পরিধি বাড়ালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা আরও গবেষণায় উৎসাহী হবেন এবং বেরোবিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবেন।
রাজশাহীর একটি সাধারণ গ্রাম থেকে শুরু করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগসেরা হয়ে গবেষণার কঠিন পথ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে জায়গা করে নেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সুমন মাহমুদের চীনের টিওয়াইইউটিতে ফুল ফান্ডেড উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে সীমিত সুযোগ সবসময় স্বপ্নের সীমা নির্ধারণ করে না। তাই দৃঢ় সংকল্প, নিরলস পরিশ্রম ও নিজের লক্ষ্যের প্রতি অবিচল আস্থা থাকলে শত প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।