খেলাধুলায় কোয়ান্টামের অভাবনীয় সাফল্য: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেলেন ৭ কৃতী অ্যাথলেট
আমিনুল ইসলাম খন্দকার ,বান্দরবান প্রতিনিধি
"ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা"—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ উদ্যোগে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ক্রীড়া ভাতা পেয়েছেন বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী শিক্ষায়তন কোয়ান্টাম কসমো স্কুল ও কলেজের ৭ জন কৃতী ক্রীড়াবিদ।
সরকারের দুই ধাপে দেশের ৩০০ জন শীর্ষ ক্রীড়াবিদকে এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে, যার মধ্যে কোয়ান্টামের এই ৭ জন রয়েছেন। র্যাংকিং-এর ভিত্তিতে নির্বাচিত এই কার্ডধারী ক্রীড়াবিদরা প্রতি মাসে এক লক্ষ টাকা করে ক্রীড়া ভাতা পাচ্ছেন।
গত ৩০ মার্চ (২০২৬) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রথম ধাপের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে এই ঐতিহাসিক ‘ক্রীড়া কার্ড’ তুলে দেন। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে, গত ১৯ এপ্রিল (২০২৬) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) অডিটোরিয়ামে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক আরও ১৭১ জন খেলোয়াড়ের হাতে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা তুলে দেন।
"অলিম্পিকে সোনা আমরা জিতবই"—এই দৃঢ় প্রত্যয় ও লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সহযোগিতায় কোয়ান্টামে শুরু হয়েছিল "আমরা পারি জিমন্যাস্টিকস" কার্যক্রম। দেখতে দেখতে পার হয়ে গেছে এক যুগ। গত ১২ বছরে জাতীয় পর্যায়ে ২১৮টি স্বর্ণপদকসহ মোট ৫৫৬টি পদক জিতে দেশের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে এই প্রতিষ্ঠানটি। ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য এই অবদানের ধারাবাহিকতায় এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ স্বীকৃতি ও ক্রীড়া কার্ড পেয়েছেন কোয়ান্টামের ৪ জন চৌকস জিমন্যাস্টসহ টেবিল টেনিস ও ভলিবলের দুই সেরা তারকা।
জিমন্যাস্টিকসে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়া চার জনের একজন উহাইমং মার্মা। বান্দরবানের থানচির এক জুমচাষি পরিবারের সন্তান উহাইমং মাত্র ৫ বছর বয়সে ২০১১ সালে কোয়ান্টামে ভর্তি হন। বর্তমানে তিনি এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং জাতীয় জিমন্যাস্টিকস দলের একজন অপরিহার্য সদস্য। গত ৩০ মার্চ তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মানজনক এই ক্রীড়া কার্ড গ্রহণ করেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কার্ড নেন আরেক কৃতী জিমন্যাস্ট রাজীব চাকমা। ২০১০ সালে কোয়ান্টামের সূচনা শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া রাজীব ২০২৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। গ্রামের সাধারণ টিনের ঘরের সীমিত সুবিধা থেকে উঠে এসে কঠোর অধ্যবসায়ে তিনি আজ জাতীয় দলের জিমন্যাস্ট এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
এই তালিকায় আরও রয়েছেন রাঙামাটির নানিয়ার চরের সন্তান নিঝুম খীসা। কোয়ান্টাম বিদ্যাপীঠে দীর্ঘ ১৪ বছর পার করা নিঝুম ২০২৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হন। ইতিমধ্যে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আসর মাতানো এই জিমন্যাস্ট গত ১৯ এপ্রিল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে তাঁর কার্ড গ্রহণ করেন। একই দিনে প্রতিমন্ত্রীর কাছ থেকে ক্রীড়া কার্ড লাভ করেন সাংখেঅং খুমি কিতং। মাত্র ৩ বছর বয়সে ২০০৫ সালে কোয়ান্টামে ভর্তি হওয়া কিতং ২০২০ সালে সফলভাবে এইচএসসি পাস করেন। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তিনি নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
শুধু জিমন্যাস্টিকসেই নয়, টেবিল টেনিস ও ভলিবল খেলাতেও কোয়ান্টামের সাফল্য এখন দেশজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। ক্রীড়াবিদদের এই সাফল্যকে আরও বেগবান করতে গত বছরের ৩০ আগস্ট (২০২৫) কোয়ান্টামে একটি আধুনিক টেবিল টেনিস একাডেমি ভবনও উদ্বোধন করা হয়েছে। এবার টেবিল টেনিস ও ভলিবল বিভাগ থেকেও এসেছে বড় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
টেবিল টেনিসে দেশের বর্তমান ১ নম্বর র্যাংকিংধারী তারকা খই খই সাই মার্মা গত ৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া কার্ড গ্রহণ করেন। রাঙামাটির রাজস্থলীর এই সন্তান কোয়ান্টাম থেকে খেলাধুলার প্রাথমিক পাঠ শেষ করে পরবর্তীতে বিকেএসপিতে (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান) স্থানান্তরিত হন। টেবিল টেনিসে স্বীকৃতি পাওয়া অপর তারকা হলেন রামহিমলিয়ান বম। ২০০৮ সালে মাত্র ৩ বছর বয়সে কোয়ান্টামে ভর্তি হওয়া রামহিম ২০১২ সাল থেকে টেবিল টেনিসের সাথে যুক্ত হন। আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সফল এই তারকাকে গত ১৯ এপ্রিল যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বিশেষ ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড প্রদান করেন।
এদিকে ভলিবল অঙ্গনে কোয়ান্টামের মুখ উজ্জ্বল করেছেন দেশের উদীয়মান নারী তারকা মৌমৌ খই মার্মা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া পিতৃহারা এই অদম্য মেয়েটি ২০২৫ সালে এসএসসি পাস করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় নারী ভলিবল দলের অন্যতম সেরা ও নির্ভরযোগ্য সদস্য। ক্রীড়াক্ষেত্রে তাঁর এই অনন্য অবদানের জন্য গত ৩০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মানজনক ক্রীড়া কার্ড প্রদান করেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই তরুণ ক্রীড়াবিদদের হাত ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গন আগামীতে আরও বহুদূর এগিয়ে যাবে বলে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
এই ঐতিহাসিক অর্জন প্রসঙ্গে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন শিক্ষাসেবা কার্যক্রমের ইনচার্জ জনাব ছালেহ আহমেদ বলেন, "জাতিগতভাবে অলিম্পিকে স্বর্ণ জয়ের লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে 'অলিম্পিকে সোনা আমরা জিতবই'- বাক্যটিকে জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় করে তোলে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন। সরকারের ক্রীড়াবিদদের পেশাগত স্বীকৃতি, ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড প্রদানের এই মহতী উদ্যোগে খেলোয়াড়দের মধ্যে যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশও একদিন অলিম্পিকে স্বর্ণ জিতবে ইনশাআল্লাহ।"
উল্লেখ্য, কোয়ান্টাম ফুটবল, ভলিবল ও টেবিল টেনিসের মতো খেলাগুলোতে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক মাঠ ও ইনডোর সুবিধা নিশ্চিত করেছে।