ঈদুল আজহা ঘিরে ব্যস্ত লামার কামারপল্লী, দিন-রাত চলছে হাতুড়ির ‘টং-টাং’ শব্দ

আমিনুল ইসলাম খন্দকার, বান্দরবান প্রতিনিধি 

May 24, 2026 - 13:49
 0
ঈদুল আজহা ঘিরে ব্যস্ত লামার কামারপল্লী, দিন-রাত চলছে হাতুড়ির ‘টং-টাং’ শব্দ

 হাপরের টানে দাউ দাউ করে জ্বলছে কয়লার চুলা, তপ্ত আগুনে লোহা হয়ে উঠছে সূর্যবর্ণ। সেই দগদগে লাল লোহায় দিন-রাত হাতুড়ি পেটানোর 'টং-টাং' শব্দে এখন মুখরিত বান্দরবানের লামা বাজারের কামারপল্লী। পবিত্র ঈদুল আজহা যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে কামারদের ব্যস্ততা। কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার প্রধান অনুষঙ্গ দা, ছুরি, বঁটি আর চাপাতি তৈরি এবং পুরোনোগুলোতে শাণ দেওয়ার কাজে দিন-রাত এক করে ঘাম ঝরাচ্ছেন স্থানীয় কারিগররা।

​বান্দরবান জেলার অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক কেন্দ্র লামা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাতাসে কয়লার গন্ধ আর চারদিকে হাতুড়ি ও লোহার মিতালিতে তৈরি হওয়া চেনা 'ঠুকঠাক' শব্দ। তপ্ত লোহা পিটিয়ে নতুন নতুন সরঞ্জাম তৈরিতে এখন দম ফেলার ফুসরত নেই এ শিল্পের কারিগরদের।

​কামারশালার কয়েকজন কারিগরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব সরঞ্জাম তৈরিতে সাধারণত দুই ধরণের লোহা ব্যবহার করা হয়—স্প্রিং লোহা (পাকা লোহা) ও কাঁচা লোহা। এর মধ্যে স্প্রিং লোহার তৈরি উপকরণের মান ভালো ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় চাহিদা ও দাম কিছুটা বেশি। আর কাঁচা লোহার তৈরি জিনিসের দাম তুলনামূলকভাবে কম। এছাড়া দা, ছুরি, কাটারি, বঁটি ও কুঠার তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে এঙ্গেল, ব্ল্যাকবার, রড, স্টিল, রেললাইনের লোহা এবং গাড়ির পাত (স্প্রিং) ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

​বাজার ঘুরে দরদামের তথ্যে জানা গেছে, বর্তমানে আকার ও মানভেদে বিভিন্ন ধরণের দা, ছুরি ও চাপাতি ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতি কেজি ওজনের লোহার তৈরি বঁটি দা বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায় এবং মাঝারি আকারের টাকসাল দা পাওয়া যাচ্ছে ৯০০ টাকায়। এছাড়া সাধারণ বঁটি দা ৫০০ টাকা এবং কোপের দা ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

​মাংস কাটার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় চাপাতি প্রতি কেজি ওজনের ক্ষেত্রে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পিস হিসেবে ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, পশু জবাইয়ের বড় ছুরি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে, মানভেদে কিছু বড় ছুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পিস। পশুর চামড়া ছাড়ানোর ছোট ছুরিগুলোর দাম ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া আকার ও মানভেদে সাধারণ দা ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং হাঁসুয়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পিস হিসেবে বিক্রি হচ্ছে।

লামা বাজারের কামার কালি শংকর কর্মকার বলেন, “আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে গেলেও কোরবানির ঈদে কামার শিল্পের কদর কিছুটা বাড়ে। কেউ নতুনভাবে পশু কাটার সরঞ্জাম কিনছেন, আবার কেউ পুরোনো সরঞ্জামে শান দিয়ে নিচ্ছেন। তবে লোহাসহ বিভিন্ন কাঁচামাল ও জ্বালানি কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় খাটুনি অনুযায়ী লাভ অনেক কম।” 

ঈদের এই ব্যস্ততা নিয়ে বাজারের কামার লিটন কর্মকার জানান, বছরের এই সময়টাই তাদের মূল উপার্জনের মৌসুম। বর্তমানে নতুন দা-বঁটি তৈরি এবং পুরোনোগুলোতে শান দেওয়ার কাজে দম ফেলার ফুসরত নেই তাদের। সাধারণ মানুষের বিশ্বাস—হাতে তৈরি লোহার সরঞ্জাম বেশি টেকসই এবং এর ধারও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

​তবে এই মৌসুমে কাজের প্রচুর চাপ থাকলেও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাচ্ছেন না জানিয়ে লিটন কর্মকার আক্ষেপ করে বলেন, বর্তমান তরুণ বা নতুন প্রজন্ম এই কষ্টসাধ্য পেশায় আর আসতে চাইছে না। ফলে দিন দিন কামার শিল্পে যে শ্রমিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা এই শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য বেশ চিন্তার বিষয়।

​লামা বাজারের কামার গলিতে দা-ছুরি কিনতে আসা ক্রেতা মাসুদুর রহমান বলেন, "আমি এখানে কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য দা, চাপাতিসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে এবং পুরনোগুলোতে শান দিতে এসেছি। কোরবানি উপলক্ষে বছরের এই একবারই কামারদের কাছে আসা হয়। যাতে সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কোরবানির মাংস কাটাকাটি করা যায় এবং পরিবারের গৃহিণীদেরও কাজ করতে সুবিধা হয়।"

ঈদের আগে কামারদের ব্যস্ততা যখন তুঙ্গে, তখন তাদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘনঘন লোডশেডিং। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বৈদ্যুতিক শান মেশিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না। ফলে কাজের গতি কমে গিয়ে সময় ও খরচ—দুটোই বেড়ে যাচ্ছে। বছরের এই সবচেয়ে ব্যস্ত সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় যথাসময়ে গ্রাহকদের অর্ডার বুঝিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা। তাই ঈদের আগের দিনগুলোতে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।