ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীদের আড্ডায় পরিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার
প্রিতোষ রায়, কনট্রিবিউটিং রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের প্রাণকেন্দ্র চাষাড়া এবং চাষাড়ার প্রাণকেন্দ্র শহীদ মিনার। নারায়নগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে নারায়নগঞ্জবাসীর আবেগও বলা চলে। একেবারে কিশোর-কিশোরি থেকে আবাল বণিতা বৃদ্ধ সকলেরই ব্যস্ততার মাঝে একটু স্বস্তির সময় কাটানোর ও কাছের মানুষের সঙ্গে গল্প করতে শহীদ মিনা পছন্দের জায়গা।
তবে সকলের প্রিয় এই শহীদ মিনার যেন এখন স্কুল-কলেজের কিছু বখে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আড্ডাখানা। পুরো শহীদ মিনারজুড়েই তাদের আনাগোনা এবং প্রকাশ্যেই চলে ধূমপান। এছাড়া কিছু তরুণ-তরুণী বেদি ও আশপাশে বসে চুটিয়ে প্রেম করছে। এসবের সবই হচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে। তবে এদের এমন দৃশ্যে আগত সবাই বিব্রত হলেও অজানা কারণে কেউ কিছু বলছে না কাউকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি তোলারাম কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, নারায়নগঞ্জ কমার্স কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজ চলাকালীন সময়ে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শহীদ মিনারে এসে সময় কাটাচ্ছে।
এসময় তাদের এক অন্যের সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ট সময় কাটাতেও দেখা গেছে। তাদের এমন আচরণে মনে হচ্ছে সরকারি-বেসরকারি ওই সব কলেজগুলোর ক্যাম্পাস যেন এখন চাষাড়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। প্রতিনিয়ত সকালে নিজ বাসা থেকে কলেজের উদ্দেশে পরিপাটি হয়ে বের হয়ে কলেজে না গিয়ে চলে আসে শহীদ মিনারে। এসেই শুরু হয় বন্ধু-বান্ধব নিয়ে মাতামাতি, প্রকাশ্যে ধূমপান ও প্রেম-ভালোবাসা বিনিময়।
তাদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারন মানুষও এখন শহীদ মিনারে এসে সময় কাটাতে অস্বস্তি বোধ করেন। তবে তাদের এসব কর্মকাণ্ডের উপর যেমন নজর নেই অভিভাবকদের, একইভাবে নজর নেই স্ব স্ব কলেজ ক্যাম্পাস শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদেরও। তদারকির অভাবে দিন দিন বখে যাচ্ছে আমাদেরই কারও আদরের সন্তান কিংবা কারও ভাইবোন।
এই বিষয়ে প্রতিবেদকের সাথে কথা হলে আক্ষেপ প্রকাশ করেন বয়োজ্যেষ্ঠ মো. রবিউল। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনার আসলে ছোট-বড় সকলের আড্ডাস্থান। তবে মাঝে মাঝে যখন আমার সামনে আমার সন্তানের বয়সি কোনো ছেলে প্রকাশ্যে ধূমপান করে, তখন আমি লজ্জা পাই। আমার ছেলেও সরকারি তোলারাম কলেজে পড়াশোনা করে। আমি যতটুক সম্ভব চেষ্টা করি এই বাজে আড্ডা থেকে তাকে দূরে রাখতে। তারপরেও আমি আতঙ্কে থাকি কবে যেন হঠাৎ দেখি আমার ছেলেও শহীদ মিনারে প্রকাশ্যে ধূমপান করছে। কারণ কথায় আছে "সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে।" এটা সত্যিই আমাদের জন্য খুবই লজ্জার।
রবিউল আরও বলেন, ‘আমরা যারা স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তি, তাদের কাছে এই শহীদ মিনার এবং শহীদদের বেদীর একটা আলাদা সম্মান আছে। আমি বিশ্বাস করি এটি একটি পবিত্র জায়গা। এখানে এমন অশালীন আচরণ, প্রকাশ্যে ধূমপান ও জুতা পায়ে উঠলে ভাষা শহীদদের অপমান করা হয়। তাই আমি বলবো আমাদের সকলের এখন এই বিষয়ে আওয়াজ তোলা উচিৎ। সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ভূমকিা রাখতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে উপস্থিত স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসা করলে তারা প্রতিবেদককে এড়িয়ে অন্যত্র চলে যায়।
এ বিষয়ে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক ও নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বির সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এই যে শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে ধূমপান করছে এটা আমাদের সংস্কৃতির অধপতনের একটা চিত্র এবং সামগ্রিকভাবে এটার দায় অনেক সংগঠনের, প্রতিষ্ঠানের এবং বিশেষ করে রাষ্ট্রের। এই যে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এখানে এসে আড্ডা দিচ্ছে, ধুমপান করছে এটা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতির একটা ধস। তারা পরিবার ও রাষ্ট্র থেকে যে শিক্ষা পাচ্ছে, বলা চলে এটা তারই প্রতিফলন। যদি সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতির পরিবর্তন না হয় তাহলে এই সমস্যার সমাধান করা যাবে না।
শহীদ মিনারের দেখভালের দায়িত্বে থাকা সিটি করপোরেশনের কিছু করণীয় আছে কি না জানতে চাইলে তিনি আরও যোগ করেন, ‘শিক্ষার্থীদের শাসন করার এখতিয়ার নগর প্রশাসনের নেই। সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব শুধুমাত্র শহীদ মিনার পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা। এর বাহিরে আসলে তাদের করণীয় তেমন কিছুই নেই। মূলত আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের এই বিষয়ে অগ্রণি ভূমিকা রাখতে হবে।’
অন্ধকার শেষে যেমন আলোর দেখা মিলে, ঠিক তেমনই এই শহরের একটু প্রশান্তি পেতে ছুটে যাওয়া শহীদ মিনারের পরিবেশ ঠিক হবে। চায়ের কাপে চুমুক দিতে স্বজ্জনদের আড্ডায় মুখরিত হবে শহীদ মিনার এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।