চমেক হাসপাতাল থেকে ১৫ মাসের শিশু অপহরণের ১৪ ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার, গ্রেপ্তার দম্পতি
পারভেজ বাঙালী, চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে অভিনব কায়দায় অপহৃত ১৫ মাস বয়সী এক কন্যাসন্তানকে মাত্র ১৪ ঘণ্টার মধ্যে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (১১ জুলাই) ভোরে নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট এক কিলোমিটার এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার এবং আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল রানার শ্যালিকা মোছাম্মৎ রিমির তিন দিনের এক নবজাতক অসুস্থ হলে গত ৯ জুলাই তাকে চমেক হাসপাতালের এনআইসিইউ-তে (৬ষ্ঠ তলার ৩২ নম্বর ওয়ার্ড) ভর্তি করা হয়। নবজাতকের মা প্রসবজনিত জটিলতায় চকরিয়ায় চিকিৎসাধীন থাকায় শিশুটির দেখাশোনার জন্য ওই রাতেই সোহেল রানার শ্বশুর, শাশুড়ি, স্ত্রী তসলিমা জান্নাত নীলা এবং তাদের ১৫ মাস বয়সী কন্যাসন্তান নাজেহাদ হাসপাতালে আসেন।
রাতে থাকার সুনির্দিষ্ট জায়গা না থাকায় সোহেল রানার স্ত্রী এনআইসিইউ-তে অবস্থান নেন এবং শাশুড়ি নাতনি নাজেহাদকে নিয়ে হাসপাতালের ৫ম তলার ২৮ নম্বর নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডের বারান্দায় ঘুমান।
পরদিন ১০ জুলাই বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এক অজ্ঞাতনামা নারী এসে সোহেল রানার শাশুড়ির সাথে সুকৌশলে আলাপ জমান। নিজেকে সোহেল রানার স্ত্রী তসলিমা জান্নাত নীলার 'বান্ধবী' পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত বিশ্বস্ত পরিবেশ তৈরি করেন ওই নারী।
একপর্যায়ে ১৫ মাস বয়সী শিশু নাজেহাদ কান্নাকাটি শুরু করলে, ওই নারী দোকান থেকে চিপস কিনে দেওয়ার কথা বলে শিশুটিকে কোলে নেন। সরল বিশ্বাসে শাশুড়িও নাতনিকে তার কোলে দেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই নারী আর ফিরে আসেননি।
পরে শাশুড়ি বিষয়টি নীলাকে জানালে নীলা জানান যে, হাসপাতালে তার কোনো বান্ধবীর সাথে দেখাই হয়নি। মুহূর্তেই পরিবারটির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালের আনাচে-কানাচে ও সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও শিশু নাজেহাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।
সন্তানকে না পেয়ে দিশেহারা বাবা সোহেল রানা দ্রুত পাঁচলাইশ মডেল থানায় গিয়ে একটি লিখিত এজাহার দায়ের করেন। অভিযোগ পেয়েই পাঁচলাইশ থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা (মামলা নং-১০, তারিখ: ১১/০৭/২০২৬) রুজু করে।
মামলা হওয়ার পরপরই পাঁচলাইশ মডেল থানার একটি চৌকস টিম মাঠে নামে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অপহরণকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। অবশেষে শনিবার (১১ জুলাই) ভোর সাড়ে ৬টার দিকে চান্দগাঁও থানাধীন এক কিলোমিটার এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহৃত শিশু নাজেহাদকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
শিশু অপহরণের দায়ে ঘটনাস্থল থেকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় দুইজনকে। তারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন:
১. নাছিমা বেগম (২৫), স্বামী- বোরহান উদ্দীন, সাং- ম্যাক পাশান (সুখচর), থানা- হাতিয়া, জেলা- নোয়াখালী।
২. বোরহান উদ্দীন (৩০), পিতা- মফিজুর রহমান, সাং- চাম্বল (মালিনি মুরা), থানা- বাঁশখালী, জেলা- চট্টগ্রাম।
পাঁচলাইশ মডেল থানা পুলিশ জানায়:
"হাসপাতাল থেকে শিশু চুরির ঘটনাটি জানার পরপরই আমরা এটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুততম সময়ে আসামিদের অবস্থান নিশ্চিত করে অভিযান চালানো হয়। শিশুটিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। চমেক হাসপাতালের মতো জনাকীর্ণ স্থানে অপরিচিত কারও হাতে নিজেদের সন্তান দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সতর্ক হওয়ার অনুরোধ রইল।"