নির্যাতনের ভিডিও দেখে মারা গেলেন এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ রাব্বি মা-বাবা

মেজবাহ উদ্দিন,কনট্রিবিউটিং রিপোর্টার মাদারীপুর

Jun 16, 2026 - 18:59
 0
নির্যাতনের ভিডিও দেখে মারা গেলেন এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ রাব্বি মা-বাবা
রফিকুল ইসলাম

ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন মাদারীপুরের যুবক রফিকুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে। পরিবারের অভিযোগ, লিবিয়ায় আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য রাব্বির ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় মানবপাচারকারী চক্র। নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠানো হলে তা দেখে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রাব্বির বাবা ও মা। কয়েক দফায় ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধের পরও এক সপ্তাহ ধরে রাব্বির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন সদর উপজেলার মধ্য খাগদী এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম রাব্বি। পরিবারের অভিযোগ, ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে তাকে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হলে প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান তার বাবা জলিল বেপারী এবং ছয় মাস আগে মৃত্যুবরণ করেন মা মেহেরুন নেছা।

স্বজনদের দাবি, রাব্বিকে মুক্ত করা  আশায় ভিটেমাটি বিক্রি ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে কয়েক দফায় মোট ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও রাব্বির মুক্তি মেলেনি। বরং গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

পরিবারের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের সদস্য সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের তালতলা এলাকার আয়ুব আলী মাতুব্বরের ছেলে রিয়াজুল মাতুব্বর, তার শ্বশুর মধ্য খাগদী এলাকার জামাল ফকির এবং শাশুড়ি রোমানা বেগমের সঙ্গে চুক্তি করেই রাব্বিকে বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইতালিতে পাঠানোর পরিবর্তে তাকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন চালিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

রাব্বির সন্ধানের দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান স্বজনরা। সেখানে গিয়ে তারা সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাননি বলে অভিযোগ করেন।

তথ্য অনুযায়ী, তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাব্বি সবার ছোট। তাকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে ঋণদাতাদের চাপ, অন্যদিকে রাব্বির নিখোঁজ থাকার ঘটনায় পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

রাব্বির বড় বোন তানজিলা আক্তার বলেন, “আমার ভাইকে জিম্মি করে মোট ৮৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই এবং আমার ভাইকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই।”

স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বেপারী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন প্রতারণার শিকার না হয়।”

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত রোমানা বেগম। তিনি বলেন, “রফিকুল ইসলাম রাব্বি কোথায়, কার মাধ্যমে বিদেশে গেছেন সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। টাকা লেনদেনের বিষয়েও আমার কোনো ধারণা নেই। আমার জামাই রিয়াজুল মাতুব্বর ইতালিতে থাকেন।”

এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা বলেন, “পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইতোমধ্যে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে।”